সিজার অপারেশন আবিষ্কার: অবশ না করে ৩০ বার কাটাছেঁড়া কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসীকে


সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের পিয়ারসন মিউজিয়ামে রক্ষিত অ্যানার্কা ওয়েস্টকোটের আলোকচিত্র। সি–সেকশন বা সিজারিয়ান অপারেশনসহ স্ত্রীরোগের চিকিৎসায় নানা উন্নতির ধারাবাহিকতায় গাইনিবিদ্যা আজ যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে পৃথিবীব্যাপী বহু মায়ের জীবন বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে শুধু ব্যবসায়িক লাভের জন্য অপ্রয়োজনীয় সিজার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেলেও এই অস্ত্রোপচার কৌশলটি কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যায় একটি যুগান্তকারী ঘটনা। গর্ভজনিত জটিলতায় মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে এই অস্ত্রোপচারের বিকল্প নেই। 

কিন্তু এই চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন ও উন্নয়নের পেছনে যে তিনজন নারী অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন সেটি অনেকেরই অজানা। আজ ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসে সেই নারীদের গল্পই বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন শুরুর পরই কেবল তাঁরা আলোচনায় এসেছেন। দুঃখের বিষয় এর আগে খোদ গাইনিবিদ্যার সঙ্গে জড়িতরাও তাঁদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না! 

অ্যানার্কা ওয়েস্টকোট, বেটসি এবং লুসি—এই তিন নিগ্রো নারী ছিলেন ক্রীতদাস। ১৮৪০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের মন্টগোমেরির কাছে বিভিন্ন কৃষি খামারে কাজ করতেন তাঁরা। সন্তান প্রসব পরবর্তী জটিলতায় তাঁরা মূত্রাশয় এবং অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই অবস্থায় অন্য ক্রীতদাসীদের থেকে তাঁদের আলাদা করে রাখা হয়। কোনো চিকিৎসা না থাকায় তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল সারা জীবন এই যন্ত্রণা এবং লজ্জা বয়ে বেড়াতে হবে। 

অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসিকে নিয়ে হতাশ ছিলেন তাঁদের শ্বেতাঙ্গ মালিক। কারণ তাঁদের দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করানো যাচ্ছিল না, এতে উপার্জন কমে যাচ্ছিল। তাই একটা প্রতিকার খুঁজছিলেন মালিক। ১৮৪৪ সালে তিন ক্রীতদাসীকে চিকিৎসক জে. মেরিয়ন সিমসের কাছে পাঠানো হয়। 

 ১৮০০–এর দশকে অন্য অনেক চিকিৎসকের মতো মেরিয়ন সিমস চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খুব আগ্রহী ছিলেন। তিনি দন্ত্যচিকিৎসা থেকে শুরু করে শিশুরোগ ও সাধারণ অস্ত্রোপচারসহ সব ধরনের চর্চাই করতেন। ১৮৩৫ সালে দুইজন রোগী মারা যাওয়ার পর তিনি দক্ষিণ ক্যারোলিনা থেকে অ্যালাবামায় চলে আসেন। অবশেষে মন্টগোমারি কাউন্টিতে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসির মালিকের নজরে পড়েন। 

সিমস ওই সময় অস্ত্রোপচারের একটি নতুন উপায় আবিষ্কার করেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ছয় মাসের মধ্যে অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসিকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন। নতুন আবিষ্কৃত অস্ত্রোপচার কৌশলটি পরীক্ষা করার জন্য তিনি ওই তিন ক্রীতদাসীকে ভাড়া নেন। মালিককে টাকা দিয়ে ইজারা নেওয়ার কারণে তিন নারীর শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পান তিনি। আর ওই সময়ের চর্চা অনুযায়ী এটা বলাবাহুল্য যে, এর জন্য তিন নারীর কাছ থেকে কোনো ধরনের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। 

সিমসের অপারেশন টেবিলে যাওয়া প্রথম নারী ছিলেন লুসি। অপারেশনের কক্ষটিতে ছিল তখনকার উদীয়মান চিকিৎসকদের ভিড়। তাঁরা পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে চেয়েছিলেন। লুসিকে একবারও জিজ্ঞেস করা হয়নি এতগুলো পুরুষের চোখের সামনে অপারেশনের টেবিলে শুতে তিনি অস্বস্তিবোধ করছেন কি না। লুসিকে নগ্ন অবস্থায় অপারেশন কক্ষে আনা হয়। এরপর টেবিলের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা হয় যাতে অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়ার কারণে কাজ ব্যাহত না হয়। অস্ত্রোপচারের আগে লুসিকে কোনো অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়নি। কারণ তখন শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের ধারণা ছিল, কালো মেয়েরা ব্যথা অনুভব করে না, বা তাদের অনুভূতিগুলো ঠিক শ্বেতাঙ্গদের মতো কাজ করে না! 

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী লুসির শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। এই পুরোটা সময় তিনি সচেতন ছিলেন। ছুরি কাঁচির প্রতিটি আঘাত চোখ বন্ধ করে সহ্য করেন। 

অস্ত্রোপচারের পরে লুসির মূত্রাশয়ে একটি বিশেষ ডিভাইস স্থান করেন সিমস। সেখান থেকে ভয়ানক সংক্রমণ হয়। চরম যন্ত্রণার দিনগুলো লুসির কীভাবে কেটেছে তা বর্ণনা করার মতো নয়! ডাক্তার সিমস অবশ্য শেষ পর্যন্ত সংক্রমণ নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু লুসির মূত্রাশয় সারানোর অপারেশনটি ব্যর্থ হয়েছে। 

বেটসি ছিলেন সিমসের ছুরি কাঁচির নিচে পড়া দ্বিতীয় নারী। লুসির মতো, বেটসিকেও অনেকগুলো পুরুষের সামনে অপারেশন টেবিলে নগ্ন করে শোয়ানো হয়। কোনও অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়নি। সিমস মূত্রাশয়ের জন্য উদ্ভাবিত একটি যন্ত্র সেখানে স্থাপন করেন। বেটসি অবশ্য লুসির মতো অস্ত্রোপচার পরবর্তী সংক্রমণের সমস্যায় পড়েননি। কিন্তু বেটসির ক্ষত সারানো যায়নি। এই অপারেশনটিও ব্যর্থ হয়। 

সবশেষে অস্ত্রোপচার কক্ষে আনা হয় অ্যানার্কা ওয়েস্টকোটকে। অ্যানার্কা তখন সবে কিশোরী। এর মধ্যে প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এমন সময়ে তাঁকে সন্তানের কাছ থেকে আলাদা করে ডাক্তার সিমসের অস্ত্রোপচার কক্ষে পাঠানো হয়। কোনো ধরনের অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই তাঁকে লুসি ও বেটসির মতো একই অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। 

তবে যখন অ্যানার্কার ওপর করা অস্ত্রোপচারের ফলাফল ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়ে যায়, তখন স্থানীয় চিকিৎসকেরা বলেন, সিমস ব্যর্থ হয়েছেন। সিমসের পরীক্ষাগুলোকেও তাঁরা সমর্থন করা বন্ধ করে দেন। অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসি সিমসের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যান। কারণ তাঁদের রোগ সারেনি, ফলে মালিকের কাছে তাঁরা তখনো অকেজো। তাঁরা বাধ্য হয়েই সিমসের পরিবারের জন্য কাজ করেন। 

সিমস তখন তাঁর শ্বেতাঙ্গ পুরুষ সহকারীদের বাদ দিলেও পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালিয়ে যান। অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসিকে আগেই সহকারীদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। অপারেশনের আগে ও পরে কীভাবে যত্ন নিতে হয় তা তাঁদের শিখিয়ে দেন। অবশ্য সিমসকে সহযোগিতা করা ছাড়া তিন নারীর কাছে কোনো বিকল্পও ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁরা দক্ষ চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। 

এর পরের পাঁচ বছর অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসির ওপর ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান ডাক্তার সিমস। পরীক্ষার জন্য আরও ক্রীতদাস নারীদেরও ভাড়ায় আনেন। ক্রীতদাস নারীরা গর্ভাবস্থায় সঠিক পরিচর্যা পান না, ফলে নানা জটিলতায় ভোগেন তাঁরা। সে কারণে সিমসেরও রোগীর অভাব হয়নি। সিমস মোট ১২ জন ক্রীতদাসীর ওপর তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি পরীক্ষা করেন। তবে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনে শুধু অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসির নাম রয়েছে। 

 ১৮৪৯ সালের গ্রীষ্মে অ্যানার্কার ওপর ৩০ তম অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করেন সিমস। গত চার বছরে যেসব নতুন সরঞ্জাম এবং কৌশল উদ্ভাবন করেছেন সেগুলো এবার প্রয়োগ করেন। অস্ত্রোপচার সফল হলো। অ্যানার্কার জখম সেরে গেল, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। নিজের উদ্ভাবিত কৌশল নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার পর সিমস তাঁর হাসপাতালটি বন্ধ করে উত্তরের দিকে চলে যান। অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধারাবাহিক যন্ত্রণা সহ্য করার পর আবার ফিরে যান মূল মালিকের কাছে। 

ডাক্তার সিমস তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’–এ স্পষ্টভাবেই বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। 

সিমস লিখেছেন, ‘আমি নিগ্রোদের মালিকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম: আপনি যদি আমাকে অ্যানার্কা এবং বেটসিকে দেন, আমি তাদের জীবন বিপন্ন করে এমন কোনো পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচার করব না। এর জন্য একটি পয়সাও চার্জ করব না। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই তাঁদের বিপরীতে ট্যাক্স এবং পোশাক–আশাক দিতে হবে।’ সিমস তাঁর স্মৃতিকথায় বড়াই করেছে লিখেছেন, ‘আমার রোগীরা তাদের জন্য আমি যা করছি তাতে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিল।’ 

 ১৮৫২ সালে সিমস একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতির রূপরেখা দেন। তবে সেখানে কখনোই উল্লেখ করেননি যেসব নারীর ওপর অস্ত্রোপচার চালিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন ক্রীতদাসী, বা টাকার বিনিময়ে তাঁদের শরীরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তিনি নিয়েছিলেন। নিবন্ধে যেসব ছবি রয়েছে, সেখানে তাঁকে একজন শ্বেতাঙ্গ নার্সের সাহায্যে শ্বেতাঙ্গ নারীর অস্ত্রোপচার করতে দেখা যায়। রোগীকেও কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করা। রোগীর সম্মানের চিহ্ন সেখানে স্পষ্ট। অথচ অ্যানার্কা, বেটসি এবং লুসি কখনো ন্যূনতম সম্মান পাননি। বহু পুরুষের সামনে নগ্ন করে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। 

সিমস পরে নারীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল করেন। সেখানে শ্বেতাঙ্গ নারীদের অস্ত্রোপচার করা হতো যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে এবং অবশ্যই অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হতো। 

ডাক্তার সিমসের কাজ এবং নিবন্ধ স্ত্রীরোগের অস্ত্রোপচারে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই অবদানের জন্য তাঁকে ‘আধুনিক স্ত্রীরোগবিদ্যার জনক’ বলা হয়। কিন্তু এই অগ্রগতিগুলোর পেছনে যে ক্রীতদাস নারীদের দীর্ঘ যন্ত্রণা এবং শোষণের ইতিহাস আছে, তা ভুলে গেলে অন্যায় হবে। অ্যানার্কা, বেটসি, লুসিসহ ডাক্তার মেরিয়ন সিমসের আরও নাম না জানা কৃষ্ণাঙ্গ রোগীরা ‘আধুনিক স্ত্রীরোগবিদ্যার মা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের শ্রম এবং অমানবিক যন্ত্রণা ছাড়া সিমসের এই ‘অর্জন’ সম্ভব হতো না।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top