ময়দানে তিহ-এ অবাধ্য বনি ইসরাইলের ৪০ বছর


প্রতীকী ছবি। ফিলিস্তিন ও শাম অঞ্চলের শক্তিশালী জাতি আমালিকার সঙ্গে যুদ্ধ করে বনি ইসরাইলকে বায়তুল মোকাদ্দাস জয় করার আদেশ দিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা। তখন বনি ইসরাইলিরা মুসা (আ.)–কে বলেছিল, ‘আপনি ও আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানে বসে থাকব।’ তখন মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘হে আমার রব, কেবল আমার ওপর ও আমার ভাইয়ের ওপর ছাড়া আমি কোনো ক্ষমতা রাখি না। অতএব আপনি আমাদের ও অবাধ্য জাতির মধ্যে ফায়সালা করে দিন।’ (সুরা মায়িদা: ২৫) 

আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেছিলেন। বনি ইসরাইলকে ৪০ বছর পর্যন্ত একটি খোলা ময়দানে অবরুদ্ধ করে রাখার শাস্তি দিলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘এ দেশটি (ফিলিস্তিন ও শাম) চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো। এই সময়ে তারা পৃথিবীতে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরবে। অতএব তুমি অবাধ্য জাতির জন্য দুঃখ করো না।’ (সুরা মায়িদা: ২৬) 

সেই খোলা ময়দানের নাম তিহ। আরবি তিহ শব্দের অর্থ পথ হারিয়ে ঘোরাফেরা করা। এই ঘটনা থেকেই মূলত এই ময়দানের নাম হয়েছে তিহ। এই ময়দানে কোনো সীমানা প্রাচীর ছিল না। ছিল না কোনো নিরাপত্তারক্ষী। বনি ইসরাইলের লোকেরা প্রতিদিন সকালে উঠে মিসরের দিকে রওনা হতো। সারা দিন চলার পর রাতে আগের জায়গায় ফিরে আসত তারা। ৪০ বছর পর্যন্ত কোনোভাবেই তারা এই ময়দানের বাইরে যেতে পারেনি। এই ছিল আল্লাহর শাস্তি। 

অবাধ্যতার কারণে আল্লাহর আজাবে বনি ইসরাইলের ধ্বংস হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকত না। তবে আল্লাহ তাদের আরও সুযোগ দেন। এই ৪০ বছরে তাদের আরও কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। এখানে কয়েকটির কথা তুলে ধরা হলো—

মেঘের ছায়া
তিহের ছায়াশূন্য ময়দানে বনি ইসরাইল সম্প্রদায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যায় এবং মুসা (আ.)-এর কাছে আরজি পেশ করে যে, আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য ছায়ার আবেদন করুন। মুসা (আ.) দয়াপরবশ হয়ে তাদের জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ছায়া পাঠালেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘স্মরণ করো সেই কথা, যখন আমরা তোমাদের মেঘমালার মাধ্যমে ছায়া দিয়েছিলাম।’ (সুরা বাকারা: ৫৭) 

১২টি ঝরনা
ছায়া তো পাওয়া গেল। কিন্তু ময়দানে তিহে পানির জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছিল বনি ইসরাইল। তখন তারা পানির জন্য মুসা (আ.)-এর কাছে আবেদন করলে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। তখন আল্লাহ বনি ইসরাইলের ১২টি গোত্রের জন্য ১২টি ঝরনা প্রবাহিত করে দিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মুসা যখন তার জাতির জন্য পানি চাইল, তখন আমি বললাম, তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করো। এরপর তা থেকে বেরিয়ে এল ১২টি ঝরনা। তাদের সব গোত্রই চিনে নিল নিজ নিজ ঘাট। (আমি বললাম) তোমরা আল্লাহর দেওয়া রিজিক খাও এবং পান করো। খবরদার! পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সুরা বাকারা: ৬০) 

জান্নাতি খাবার মান্না-সালওয়া
ময়দানে তিহে কয়েক দিনের মধ্যেই বনি ইসরাইলের খাদ্য শেষ হয়ে যায়। তখন তারা মুসা (আ.)-এর কাছে আরজি পেশ করে। মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাদের জন্য জান্নাতি খাবার মান্না-সালওয়া পাঠান। মান্না এক প্রকার খাবার, যা দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। আর সালওলা হলো এক প্রকারের পাখি। (ইবনে কাসির) 

রুটির বদলে মান্না এবং মাংসের বদলে সালওয়া পাঠিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের জন্য মান্না-সালওয়া খাবার হিসেবে পাঠিয়েছি।’ (আমি বললাম) এসব পবিত্র বস্তু খাও। …’ (সুরা বাকারা: ৫৭) 

তবে বনি ইসরাইল মান্না-সালওয়া বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। এরশাদ হয়েছে, ‘যখন তোমরা বললে, হে মুসা, আমরা একই ধরনের খাদ্যে কখনোই ধৈর্য ধরতে পারব না। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের হয়ে দোয়া করুন, তিনি যেন আমাদের এমন খাদ্য-শস্য দান করেন, যা জমিতে উৎপন্ন হয়; যেমন, তরি-তরকারি, কাঁকুড় (ধুন্দল জাতীয় সবজি), গম, রসুন, ডাল, পেঁয়াজ ইত্যাদি। মুসা বললেন, তোমরা উত্তম খাদ্যের বদলে নিম্নমানের খাদ্য পেতে চাও? তাহলে তোমরা অন্য কোনো শহরে চলে যাও। সেখানে তোমরা তোমাদের চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পাবে।’ (সুরা বাকারা: ৬১) 

পাশের জনপদে
মান্না-সালওয়ার বদলে তরি-তরকারি খেতে চাওয়ায় আল্লাহ তাদের পাশে জনপদে যেতে বলেন। ওখানে প্রবেশের সময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনেরও নির্দেশ দেন। তবে তারা তাঁর আদেশ শোনেনি। এরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন আমরা বললাম, এই নগরে প্রবেশ করো। এতে যেখানে খুশি খেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করো এবং নগরের প্রবেশ পথ দিয়ে ঢোকার সময় সিজদা করো এবং বলতে থাকো—হিত্তাতুন তথা আমাদের ক্ষমা করে দিন, তাহলে আমি তোমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করে দেব এবং সৎকর্মশীলদের সত্বর অতিরিক্ত দান করব।’ (সুরা বাকারা: ৫৮) 

তারা আল্লাহর নির্দেশিত বাক্য ‘হিত্তাতুন’ না বলে ‘হিনতাতুন’ তথা গম গম বলে ডাকতে লাগল এবং মাথা নিচু করে প্রবেশও করল না। (বুখারি: ৩৪০৩) 

এভাবেই অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে ময়দানে তিহ-এ বনি ইসরাইলের চল্লিশ বছরের দুর্বিষহ জীবনের ইতি ঘটল। ঐতিহাসিকেরা বলেন, এই চল্লিশ বছরে হারুন (আ.)-এর মৃত্যু হয়, এর তিন বছর পর মুসা (আ.)-এরও মৃত্যু হয়। শাস্তির মেয়াদ শেষে আল্লাহর নবী ইউশা ইবনে নুন (আ.)-এর নেতৃত্বে বনি ইসরাইল বায়তুল মোকাদ্দাস জয় করেছিল। 

ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিবের ‘নবীদের কাহিনী’ অবলম্বনে





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top