ফজলুল হক : জঙ্গল-পথের পথিক


১.
ষাটের দশক-পরবর্তী কোনো কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম যদি রাখেন ‘পৃথক দংশন’, তাহলে তাঁর পাঠকের পক্ষে সেই বইয়ে ‘পৃথক পালঙ্ক’-এর কবি আবুল হাসানের প্রভাব খোঁজাটা স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে তা নেই, তাঁদের পথও আলাদা, তারপরও প্রথম বই হিসেবে যদি ধরে নিই খানিকটা ছিটেফোঁটা প্রভাব ছিলই, তবু দ্বিতীয় বই ‘কবির জন্মদিন’-এ আত্মজীবন ও শিল্পজীবনকে একাকার করে তিনি যে-পথের সন্ধান করেছেন, সেই পথ কোনো একক কবির পথ নয়, সেই পথ বহু কবির, ধ্রুপদী ধারার মহাজনদেরই পথ।

এমনিতে বইয়ে ‘কবির জন্মদিন’ নামে কোনো পৃথক কবিতা নেই তাঁর, ‘জন্মের দাগ’ বলে যে-কবিতাটি আছে, তার বিষয়ও আলাদা, তাই বোঝা যায় এ-নামটি অক্ষরার্থে নয়, ব্যঞ্জনার্থে আবহ সংগীতরূপেই ব্যবহৃত, আর ‘শুরু’টাও করতে চেয়েছেন একদম শুরু থেকেই, ‘কবির জন্মদিন’ থেকে, প্রথম স্মৃতি থেকে, সম্ভবত সেই স্মৃতিই তাঁর জন্মদিনের প্রতীক, তিনি যাকে বলছেন শৈশব। কিন্তু লক্ষ করলে দেখব এই শুরুটা, ভয়ংকর কিনা জানি না, নির্মম এবং অবশ্যই শিহরণকর :

‘জনারণ্যের ভিড় ঠেলে প্রিয় সহযাত্রী আর পরম আত্মীয়দের দূরে সরিয়ে পথের বাঁকে গিয়ে দেখি, পথ গেছে জঙ্গলের দিকে। তারপরের সবটুকুই এখনও জল-জঙ্গলের ইতিহাস।’

আমার কাছে উদ্ধৃত তথ্যটুকু শুধু নয়, ধুলোমাটি-সংসারের বাস্তবতায় পুরো কবিতাটির অভিমুখই সেই নির্মমতার নজির। আত্মীয়-পরিজনকে দূরে ঠেলে দিয়ে তিনি কত সহজেই না জঙ্গলগামী, কত সহজ আর স্বাভাবিক উচ্চারণ তাঁর! প্রথম জীবনের ভোগবিলাসজাত ক্লান্তি/গ্লানি/বিবমিষা থেকে গৌতম বুদ্ধের বৈরাগ্যের শুরু, কিন্তু এই কবির প্রথম জীবনের ইতিহাসটা কী? এর জবাব এ-কবিতায় তো নেইই, বইয়ের অন্য কবিতায়ও ভোগপ্রবৃত্তির উগ্র-অনুগ্র বর্ণনা খুঁজে পাওয়া মুশকিল, এমনকি এ-কবিতায় কবিজীবনের কোনো ধারাবাহিক পরম্পরাপর্যায়ও নেই, তিনি ইচ্ছেমতো আগে-পিছে গেছেন, সময়কে গুলে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর প্রথম স্মৃতি, যা আগেই উল্লেখ করেছি, ‘শৈশব’, প্রথম দিনের সূর্য এবং কবির স্মৃতি দু’জনেই সমান বয়সী’, অর্থাৎ আদিমুহূর্ত, প্রবহমান চিরজীবনের ইঙ্গিত। শুধু মধ্যজীবনে, যার বর্ণনাও মধ্যবর্তী স্তবকে, এসেছে মায়ের কথা : একদিন পঞ্চখণ্ডের বাসুদেবের মেলায় মায়ের জন্য নিকিরির দোকান থেকে মোয়া কিনতে গিয়ে কবি টের পান তাঁর শেষ পারানির কড়িটিও হারিয়ে গেছে, শেষে, সারাদিন জগন্নাথবাড়ির পথে-প্রান্তরে ঘুরে-বেড়ানো। দেখি যে আদি পঞ্চখণ্ডের অধিবাসী এই কবি তাঁর ধ্যানমগ্ন জীবনযাপনের কারণেই হয়তো শিল্পযাত্রাকে বাস্তব ও অন্তরঙ্গ করে তুলতে কবিতার রূপক-প্রতীক-অনুষঙ্গ রূপে অনায়াসে নিয়ে আসেন ঐতিহ্যলগ্ন শব্দ ও লোকাচার-সংশ্লিষ্ট নানা প্রসঙ্গ। আসলে হাজার বছরের ঐতিহ্য মননে লালন করেন বলেই সেই চেতনা ও অনুষঙ্গ তাঁকে ঘোরগ্রস্ত করে, ধাঁধায় ফেলে দেয় :

‘হাজার বছরের চেনা-জানা পথ তাকে আলো-আঁধিয়ার কামে-প্রেমে খেলে। বেলা গেলে মা’কে মনে পড়ে। ধূলি-মলিন, রিক্ত-নিঃস্ব বাড়ি ফেরে কবি।’

কে এই মা? জল-জঙ্গলের ইতিহাস/যাত্রাপথ-এর শেষ মঞ্জিল, যেহেতু কবিতায় রয়েছে মাতৃ-রূপের পিপাসায় সিংহল সমুদ্র থেকে কালীদহ ও পারস্য বন্দরে ছুটে-বেড়ানোর বর্ণনা, নাকি মা নিজেই ইতিহাস-পথের বাধা শ্রীলেখার অস্তিত্বেরই অন্য কোনো রূপ, এ-বিষয়ে কবি নিজেও নিঃসংশয় কিনা, তা বলা মুশকিল, কারণ, সেই খাসিয়া-জৈন্তা ছুঁয়ে-আসা উত্তরে হাওয়ার স্পর্শের মধ্য দিয়ে জঙ্গলের পথে যাঁর যাত্রার শুরু, তাঁর নিঃসংশয় হওয়ার কথা নয়।
 অবশ্য মাঝে, দ্বিতীয় কবিতার বয়ান মতে, বসন্তের হঠাৎ হওয়ায়, জঙ্গলযাত্রার আগে, সুরমার তীরে কীনব্রিজের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কবি, কিন্তু আরুণি উদ্দালক আর রুমির মমতায় যার নিরন্তর ছুটে-চলা, কোনো চকিত-স্থানে দাঁড়াবার কথা নয় তাঁর, কারণ তিনি আগেই শুনতে পেয়েছেন সেই সারস্বত সত্য : ‘কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’, এবং এই বাক্যটিতে তাঁর আকাঙ্ক্ষা ও অবস্থান বিষয়ে ধারণা পেতে পারি আমরা।

২.
‘যে-সময় পেরিয়ে যাচ্ছি, এখন তথ্যের চমকপ্রদ বিস্ফোরণে হারিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়, পরম্পরাবোধ, গভীরতার তৃষ্ণা। মেঘ না চাইতে জল নয় শুধু বর্ষা নেমে আসছে’, কবিতা প্রসঙ্গে করা এই মন্তব্যে তাঁর কাব্যচিন্তার অনেকটাই ধরা পড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিগত কারণে বিস্ময় যদি কেটে যায় কারও, তাহলে তার জন্য হাহাকার করা মানে অহেতু অন্বেষণ-বিলাসকে মেনে নেওয়া, কিন্তু এই আপাতসত্যের আড়ালে আরও কিছু কথা আছে তাঁর, অন্তত তাঁর কোনো-কোনো কবিতা ও কবিতার পঙক্তি এটুকু বলতে চায় যে, এসবের কারণে শিল্প আর শিল্পীর আড়াল ও নিবিষ্টতা নষ্ট হয় আর তাতে ব্যাহত হয় কবির আকাঙ্ক্ষিত যাত্রা। ‘কবির নিয়তি’ কবিতায় রয়েছে এই বাস্তব চিত্র :

প্রচার-দুর্ঘটনায় মারা গেছে কবি, দীর্ঘদিন
তার লাশ ঘিরে আছে
নতনেত্র পাঠক স্থাবক আর মূর্খ সম্পাদক!

বেঁচে থেকে জেনেছিল,
জলের অধিক সত্য সাবান ও বুদ্বুদ
পাঁজরের আড়ালে রোদ বেড়ে
তিলফুলে তিলেতিলে পল্লবিত ভীমরুলের চাক

খাসিয়া-জৈন্তা ছুঁয়ে উত্তরের হাওয়া এসে
এখন, কবির মুঠোহাতে তীর্থযাত্রী
কিছু দীর্ণ দুর্বাঘাস এবং মৃত্তিকা।

একজন কবির জন্য দীর্ণ দুর্বাঘাস আর মাটির সামান্য সম্বল কারও কাম্য হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এ-যুগে দুর্ঘটনার কবল থেকে আত্মরক্ষা করে দীক্ষা গ্রহণ ও সম্বল-সমৃদ্ধি অর্জন একজন কবির জন্য সহজ কাজ নয়। একে ঠিক কাজ বলা যায় না, বলা উচিত সাধনা, যার বাস্তব বর্ণনা রয়েছে তাঁর ‘ঝড়-জল আর অপমানের ভিতর দিয়ে’ কবিতাটিতে, যেখানে কবিতাযাপনকে মাঝনদীতে সাঁতার কাটার সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি-এ সেই সাঁতার, যা মৃত্যু-ঘটনারই শামিল; এই যাত্রায় কবি কখনো নিজেকে খুঁজে পান আম-আঁটির ভেঁপু হাতে কোনো এক বাড়িছাড়া দিগম্বর গ্রাম্য বালকের মধ্যে, কখনো নিজেকে মনে হয় ‘নিরুদ্দিষ্ট, নিয়তিসর্বস্ব ভিখিরি’, এরপর তপোবনযাপন এবং ‘বিষের অধিক এক বায়বীয় যন্ত্রণায় কবি একসময় টের পায় সেও যাতাকলে গম’ এবং ‘প্রদীপের মতো তাকে জ্বলতে হবে ভোরের সূর্যোদয় পর্যন্ত’।

এই জ্বলনপ্রক্রিয়াই শিল্পীর অনিবার্য নিয়তি, এবং নিয়তি বলছি যদিও, তবু তাতে শিল্পীর স্বেচ্ছাবরণের খেলা বা জেনেশুনে বিষ পান করার ঘটনাও লুকিয়ে থাকে এবং একসময় কিছু করার থাকে না আর : সংসারে সমস্ত কিছু জলে ভাসিয়ে দিয়ে ফের সেই জলে নেমে একসময় কবির মনে হয় ‘নদীতে এতো জল, জলের এতো জ্বর’। কবিজীবনের এই বাস্তবতাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘এখন কবির সংসারে আগুন’-এর মতো কবিতা, যেখানে কবি দেখেন ঘর-গ্রাম-অরণ্য-জনারণ্য সর্বত্র আগুন, তাঁর মনে হয় এর চেয়ে বনবাসই ছিল ভালো। একসময় হতবাক কবি ঘরে ফেরেন আর তাঁর পেছনে রয় বৃন্দাবন, টপ্পা, খেয়াল, গজল, ঝুমুর আর আম্রপালির কত্থক অর্চনা, কারণ একসময় তিনি জানতে চেয়েছিলেন : ‘মুরলিয়া ক্যায়সে বাজাও শ্যাম’।

এই কৌতুহল আর জিজ্ঞাসাই কবিকে শিল্পের ফাঁদে ফেলে দেয়, এই ফাঁদ-পাতা ভুবনের গল্প নানা রূপক-প্রতীক-অনুষঙ্গের মাধ্যমে ঘুরে-ফিরে এসেছে বইয়ের শুরুর দিকের কয়েকটি কবিতায়। ‘দুঃখ এই যে, এতে দুঃখ নেই তোমার মনে’ কবিতায় রয়েছে সেই ফাঁদে-পড়া কবির গল্প, যেখানে নবি আল-মোস্তফা দ্বীপান্তরের শেষ দিন ডাঙা ছেড়ে যাওয়ার সময় দ্বীপবাসী ও শিশুদের উদ্দেশে কবিতা-বিষয়ে তাঁর উপলব্ধির কথা বলেন, কবিতা হচ্ছে ব্যক্তিগত শিল্পমাধ্যম, যা একান্ত নিজস্ব বলেই পবিত্র, তাঁর নির্জন কাব্যচেতনাই তাঁর জীবন, তিনি নদীর সঙ্গে কথা বলেন, বাতাসের কাঁধে হাত রেখে পাহাড়ি ঝরনায় চলে যান এবং একধরনের ‘উদ্ভাসিত যন্ত্রণা’ কবিকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, প্রফেটের ধ্যানময় জগতের এই উপলব্ধিই আসলে কবির নিজের উপলব্ধি। এ-কবিতায় রয়েছে এক ঝড়ের কথা, যাকে প্রাগৈতিহাসিক রহস্যময়ীর চিঠির মতো মনে হয় তাঁর, তিনি শরীরজুড়ে অনুভব করেন অচেনা সংগীতের আবহ, শুনতে পান এক অচেনা অশ্বারোহীর আগমনধ্বনি :

‘ঘোড়া থেকে নামে নারী। তারা শরীরজুড়ে ছায়াময়, অভ্রনীল পোশাক। সে
হাত বাড়িয়ে একটি চিঠি
কবির দিকে এগিয়ে দেয়।
কবির বুকে ঘুমিয়ে থাকা কবিতার সাদা পাতাগুলি উড়তে উড়তে তখন
পৌঁছে যায় ‘সিংহল সমুদ্র হয়ে আরো দূর বিদর্ভ নগরে!’

একজন কবির, অন্তত এই কবির তো অবশ্যই ট্রাজিক পরিণতিই এই যে, এতকিছুর পরও নৈরাশ্য পিছু ছাড়ে না তাঁর, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয় কবিকে, কারণ এরপরও কবির যে-উদ্দিষ্টা, তাঁর মন দুঃখহীন, অথচ পুরো বইজুড়েই রয়েছে কবির দুঃখিত অভিব্যক্তির প্রকাশ। ‘সব দুঃখ সঙ্গে যাবে না’ শিরোনামের আরেকটি কবিতা রয়েছে তাঁর, যা পড়লে বোঝা যায় কিছু নির্বাচিত দুঃখ নিয়ে কোথাও পৌঁছাতে চান কবি, কিছু দুঃখ সুখের মোড়কে এঁটে পথে রেখে যাবেন, আর কিছু মূর্তিমান : ‘নির্বাক, একা গৌরবে/রোদ্দুরের মধ্যে ওরা এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে।’ এ-বিষয়ে বইয়ের উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘শ্রমণের পথ’, এটি বৌদ্ধ-অনুষঙ্গে লিখিত সংকেতনির্ভর কবিতার শুরুও হয়েছে চমৎকারভাবে : অবিরাম মুখ মুছিয়ে দেয়ার পাপ/হাতের নখে লুকিয়ে/সে এসেছে নেমে’, এরপরই দুঃখ আর (শ্রমণ-)পথের বর্ণনা :

‘মহাশ্রমণের পথ
নুড়ি
এবং স্তব্ধ স্বর, পান্থ
অদৃশ্য অশ্রুর ভিতরে বিষাক্ত লতাবীজ।
এবং যখনই জীবনের কথা বলি
দুঃখ ও দুঃখজয়ের
ধ্যানীর আগ্নেয়তা, রাজস্ব ধূলায় সে
রয়েছে বসে।’

এ-বইয়ে দুঃখ ছাড়াও অনেক বার নানা প্রতীকে এসেছে পথ, ইতিহাস, জল প্রভৃতির প্রসঙ্গ, বিশেষত নানা শিল্প ও মানবযাত্রার ইশারাময় বার্তা নিয়ে এসেছে পথ। এ-প্রসঙ্গে ‘পথ হাঁটবে না’ কবিতার উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে পথ-হাঁটার প্রসঙ্গে এককাতারে উল্লেখ করেছেন বুদ্ধ, যীশু, মার্কস ও রবীন্দ্রনাথের কথা, তবে কবিতার শেষ দুটি পঙক্তি পড়তে গিয়ে বোঝা যায় এতেই রয়েছে তাঁর মূল বার্তা : আসলে, ভালোবাসার হাত না বাড়ালে/পথ কোনদিনই আমাদের সাথে হাঁটবে না’। আমরা তো পথেই হাঁটি, ভালোবাসতে পারলে, পথও তাহলে হাঁটে আমাদের সঙ্গে!

পথের হাঁটার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে আশাবাদেরই কথা, কিন্তু এ-যুগের একজন সচেতন কবি পথিকের পক্ষে আজকের পৃথিবীর নানা হতাশকর পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব নয়, কারণ তার জানার কথা, বার্তা শেষপর্যন্ত কতটুকু পৌঁছয়, কতদূর পৌঁছয়। ‘কবির দিনযাপন’ কবিতায় দেখি, যন্ত্র আর মারণাস্ত্রের চাপে মৃত পৃথিবীর জন্য কবির চোখ অশ্রুসিক্ত হয় ঠিকই, তিনি অনবরত সামানে যান তাও ঠিক, ছুটতে ছুটতে ভাবেন তিনি গণমানুষের পথেই চলেছেন, কিন্তু ‘নিজেকে দেখেন প্রায়ই কিন্তু খুঁজে পান না কখনো’, এ-হলো সমসাময়িক জগতের নিরেট বাস্তবতা।

৩.
কবিতার সঙ্গে কবির সরাসরি সম্পর্ক, এবং শিল্পসম্পৃক্ত নানা প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নিয়ে লিখিত উপরিবর্ণিত কবিতাগুলি ছাড়াও এ-বইয়ে রয়েছে আরও কিছু কবিতা যেগুলো তার শাশ্বত উপলব্ধির কারণে স্থির পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এ-ধারার কবিতাগুলোর মধ্যে ‘শেষ লোদীর ঘরে ফেরা’, ‘কয়েকটি জনপ্রিয় গাথা’, ‘ঘাস ও অর্জুনছাল’ উল্লেখযোগ্য।

‘লোদীর ঘরে ফেরা’ কবিতাটি যুদ্ধ শেষে লোদী বংশের শেষ সুলতান ইবরাহিম লোদীর ঘরে-ফেরার বিষয়টি কেন্দ্র করে লিখিত। এমনিতে ইতিহাসে সিকান্দার লোদীই লোদীবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত, বিখ্যাত ‘তারিখ-ই-দাউদী’ গ্রন্থে তাঁকে দৃঢ়চেতা, ন্যায়পরায়ণ, দরিদ্র প্রজাদের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ, সাহিত্য ও চিকিৎসা শাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক ও বিদ্বান বলে অভিহিত করা হয়েছে, সর্বোপরি তিনি ছিলেন ফারসি ভাষার খ্যাতিবান কবি, অন্যদিকে সামরিক দক্ষতা ও আন্তরিকতা সত্ত্বেও ইব্রাহিম লোদী ছিলেন উদ্ধত, অসংযমী. মাত্রাধিক কঠোরতাপরায়ণ, সে-কারণে অজনপ্রিয়। কিন্তু কবি যে তাঁকে কেন্দ্র করেই কবিতাটি লিখলেন সেখানেই তার কবিপ্রকৃতির বিশিষ্টতার পরিচয়। কবিতাটি শুরু হয়েছে সহজ ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা মধ্য দিয়ে : ‘পানিপথের যুদ্ধ শেষ—/এবার লোদী ঘরে ফিরে যাবেন। পেছনে থাকলো যতো/পার্শ্বচর-অমাত্য-উষ্ণীষ আর মূর্খ সংকেত!’। ইবরাহিম লোদী আফগান অভিজাতদের প্রতাপ ভেঙে দিতে কঠোরতা অবলম্বন করেছিলেন বলে অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়েছিল, এ-ক্ষেত্রে, ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর নীতি ও উদ্দেশ্য ছিল ঠিক, কিন্তু পন্থা ছিল বেঠিক, বোধ করি এই আন্তরিক গুণের জন্যই, অথবা বলা যায় একজন রাজা, সে গুণী হোক বা নির্গুণ, তাঁর এই পরিণতি তাঁকে ব্যথিত করেছে :

‘বিস্ময় আর বেদনার মেঘে তখনো পানিপথ আর
গুলকুন্ডার আকাশ তাকিয়ে দেখে
শেষ লোদী এবং তাঁর শেষ যুদ্ধ। ধূলায় গড়ায় ভারতবর্ষ
আর কী বিচিত্র দিপালপুরের সমস্ত নীরবতা ভাঙচুর করে
ইবরাহিম বয়ে যাচ্ছেন
না তরবারি না শিরস্ত্রাণ না স্বপ্নের ভারতবর্ষ’

এ-এক নিঃসঙ্গ যাত্রা, ভারতবর্ষ আর সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে মতো কবিও তাকিয়ে দেখছেন খসরুর খেয়ালের সহযাত্রী হয়ে শেষপর্যন্ত শেষ লোদীর ঘরে ফিরে যাওয়ার করুণ দৃশ্য। ইতিহাসের অনুষঙ্গ এসেছে ‘কয়েকটি জনপ্রিয় গাথা’ কবিতায়ও, সেখানে এসেছে নরশেরওয়াঁর চিঠির কথা, পিতার কাফনে-লেখা সেই চিঠি।
‘ঘাস ও অর্জুনছাল’ কবিতাটি নানামুখী প্রসঙ্গের কারণে জটিল, একাধিক বাক্যের পরম্পরা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল, তারপরও কবিতাটি পড়ার পর এর অনেক বাক্য মনের মধ্যে গুঞ্জন তোলে :
‘অনেকদিন ঘাস ও অর্জুনছালের সাথে কথা বলোনি, অশ্রু ও বাণীধ্বনিত বৃষ্টি তাই তোমার ছায়া। মধ্যরাত। সমস্ত জীবন যেন রশ্মিবিকিরিত দীপ্যমান বাঘের গর্জনে জানিয়ে দিলো, কর্মই ধর্ম। সাদা আলোর বর্শা তুলে তিতুমীরের কেল্লার অপেক্ষারত প্রাচীরের উপান্তে চাঁদের জলবিন্দু জেগে আছে, উত্তরার মতো মুখ।’

‘ঈতি এবং সামান্থা স্মিথ’ কবিতার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য : জটিল এবং বাক্য আর স্তবকের মধ্যেও রয়েছে চিন্তাগত দূরত্ব; তবে একথাটা ঠিক যে, বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই প্রাঞ্জল ও সুবোধ্য। পাঠকের জন্য বইয়ের সেই কবিতাগুলো আনন্দের কারণ হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top