নতুন ‘মা’ নবজাতকের যা জানতে চান


অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী : সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি যদি পূর্ণ গর্ভকাল পায়, ওজন যদি হয় ২৫০০ গ্রামের বেশি এবং জন্মের সময় শ্বাসজনিত বড় রকমের কোনো শারীরিক ত্রুটি না থাকে, তবে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক বলা যায়। এমন শিশুকে হাসপাতাল থেকে নিশ্চিন্তে বাড়ি নেওয়া যায়।


আরও পড়ুন : ত্রুটি নিয়ে জন্ম নিচ্ছে ৭ শতাংশ নবজাতক


সুস্থ নবজাতককে ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৪৮-৭২ ঘণ্টা পর বাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সুস্থ শিশুরও চাই সঠিক যত্ন। শিশুটিকে কী খাওয়াবেন, কীভাবে ধরবেন, কখন গোসল করাবেন—এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে নাজেহাল থাকেন নতুন মা। অনভিজ্ঞতার কারণে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন প্রথমবার সন্তান জন্মদানকারী মা।


যে কাজগুলো করতে হবে:


ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যেই নবজাতককে স্তন্যদান করানো যায়। তাই জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই মাতৃদুগ্ধ পান শুরু করানো উচিত।


নবজাতকের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৬.৫ ডিগ্রি থেকে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে রাখতে হবে। ‘ক্যাঙারু কেয়ার’ পদ্ধতিতে প্রসূতি মায়ের বুকে-পেটে নবজাতককে লেপটে রেখে উষ্ণ রাখা ভালো। এ পদ্ধতিতে নবজাতকের তাপমাত্রার সুরক্ষা, বুকের দুধপানে সহায়তা, মা-সন্তানের বন্ধন দৃঢ় হয়।


আরও পড়ুন : ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু


সব নবজাতককে ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যে এক ডোজ ‘কে’ ভিটামিন ইনজেকশন প্রদান করা উচিত। ১০০০ গ্রামের কম ওজনের শিশু ০.৫ মিলিগ্রাম ও তার বেশি ওজনের নবজাতক শিশু ১ মিলিগ্রাম ‘কে ভিটামিন’ দিতে হবে।


নবজাতকের চোখের সংক্রমণ প্রতিরোধে (গনোককাল জীবাণু সংক্রমণ), জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে চোখে ইরিথ্রোমাইসিন অয়েন্টমেন্ট বা ১ শতাংশ সিলভার নাইট্রেট ড্রপ দেওয়া যায়।


নবজাতককে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নেওয়ার আগেই বিসিজি, খাওয়ার পোলিও ও ‘হেপাটাইটিস বি’ টিকা প্রদান করা যায়।


শিশুর বৃদ্ধি-বিকাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য প্রথম দিকে মাসে একবার ও পরে তিন মাস অন্তর শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবেন।


আরও পড়ুন : জাতীয় কন্যাশিশু দিবস


নবজাতকের খাওয়া:


আগেই বলেছি, এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া ভালো। এরপর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ দিন, আর কিছু না। প্রথম দিকে বুকের দুধ খাওয়াতে একটু সমস্যা হতে পারে, মনে হতে পারে শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে না। কিন্তু ঘাবড়াবেন না। এর–ওর পরামর্শে কিছুতেই বাইরের দুধ দেবেন না।


সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথম আট ঘণ্টা স্তন থেকে মাত্র কয়েক ফোঁটা দুধ নিঃসরণ হতে পারে। কখনোবা প্রথম ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত এ রকম অবস্থা চলতে পারে। ষষ্ঠ দিন থেকে শিশুকে স্তন্যদান করার পর স্তন নরম হয়ে আসে। একটু ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অনেক সময় সঠিক অ্যাটাচমেন্টের অভাবে বা নিয়ম না জানার কারণে দুধ পেতে সমস্যা হয়।


হাসপাতাল ছাড়ার আগেই নার্সের কাছ থেকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম জেনে নিন। শিশু প্রথম কয়েক সপ্তাহ দৈনিক সাত-আটবার পর্যন্ত বুকের দুধ পান করবে। আট ঘণ্টা হতে চার দিন বয়স পর্যন্ত শিশু যতবার চায় ততবার বুকের দুধ খেতে দিতে হবে।


নবজাতকের আচার-আচরণ:


সাধারণভাবে জন্মের প্রথম ঘণ্টায় শিশু বেশ সতেজ ও সতর্ক থাকে। জন্মের ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে পারে। ৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা বয়সে শিশু প্রায় ঘুমিয়েই থাকে। শুধু খিদে পেলে জেগে ওঠে। একনাগাড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকলে আলতো নড়াচড়া করে তাকে জাগিয়ে বুকের দুধ দেওয়া যায়।


তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দিন শিশুর মধ্যে স্তনের খোঁজে মুখ ঘোরানো, ঠোঁট নাড়া কিংবা হাত দুটি মুখের কাছে নিয়ে আসা প্রভৃতি খেতে চাওয়ার নমুনা দেখা যায়। ষষ্ঠ দিনের পর বুকের দুধ খেয়ে পরিতৃপ্ত হওয়ার ছাপ শিশুর মধ্যে দেখা যায়।


আরও পড়ুন : ভাসমানসহ সব শিশু টিকা পাবে


নবজাতকের মলমূত্র ত্যাগ:


শিশু ৮ থেকে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত একবার কালো-সবুজ রঙের মল বা মিকোনিয়াম ত্যাগ করবে। তৃতীয় ও চতুর্থ দিন শিশুর পায়খানার রং কালো-সবুজ হতে হলুদাভ ধারণ করে। পঞ্চম দিন থেকে দৈনিক তিন থেকে চারবার দানাদার হলুদ পায়খানা করে থাকে।


নবজাতকের ঘুম:


নবজাতক রোজ ১৬-২০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে পার করে। এতে ভয়ের কিছু নেই। বুকের দুধ খেয়ে তৃপ্ত থাকলে নবজাতক কখনো বা ৪-৫ ঘণ্টাও একনাগাড়ে ঘুমোতে পারে।


নবজাতকের গোসল:


যখন শিশুর তাপমাত্রা স্বাভাবিক হবে, তখন তাকে গোসল করানো যায়। তবে ৩ দিন বয়সের আগে না। হালকা কুসুম গরম পানি করে দ্রুত গোসল সেরে নিন। তোয়ালে দিয়ে ত্বকের পানি শুষে নিন।


নবজাতকের নাভির যত্ন:


নবজাতকের নাড়ি জীবাণুমুক্তভাবে সঠিক পদ্ধতিতে কাটতে হবে, সঠিক পদ্ধতিতে বাঁধতে হবে। নাড়ি কাটার পর নাড়িতে ৭ দশমিক ১ শতাংশ ক্লোরহেক্সিডিন দিতে হবে। এর বাইরে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া নাভিতে কোনো কিছু দেওয়া বা লাগানো উচিত নয়।


সচরাচর শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক-দুই সপ্তাহ সময়ের মধ্যে নাভি শুকিয়ে ঝরে যায়। এক মাসের পরও যদি তা না ঝরে, তবে নাভির সংক্রমণ বা নবজাতকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম কি না, খতিয়ে দেখতে হবে।


আরও পড়ুন : শিশুশ্রম জাতির জন্য হুমকি স্বরূপ


যেসব লক্ষণে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে:


বুকের দুধপানে অসুবিধা


জ্বর বা অতিরিক্ত শীতল দেহ


শ্বাসকষ্ট (শান্ত অবস্থায় শ্বাস হার যদি মিনিটে ৬০ বা তার বেশি থাকে, যদি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যায়, বা ঘোঁত ঘোঁত সাঁ সাঁ শব্দ হয়)


অনবরত বমি, বমিতে রক্ত বা পিত্তরস


পেট ফোলা, ফ্যাকাশে ভাব


হাত-পা পর্যন্ত বিস্তৃত জন্ডিস, রক্তপাত


খিঁচুনি ও ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া


এসব উপসর্গ দেখা দিলে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


আরও পড়ুন : চার বছরের শিশুর কাণ্ড


নবজাতকের জন্ডিস:


জীবনের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৬০ শতাংশ পূর্ণ গর্ভকাল পাওয়া (টার্ম) নবজাতক ও ৮০ শতাংশ অকালপ্রজ (প্রিটার্ম) নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। এসব জন্ডিসের বেশির ভাগ ফিজিওলজিক্যাল বা নির্দোষ। ৫ শতাংশ প্যাথলজিক্যাল বা রোগ–সংশ্লিষ্ট জন্ডিস।


নির্দোষ জন্ডিস সাধারণত ভূমিষ্ঠ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর দেখা যায়। এই জন্ডিসে বিলিরুবিন মাত্রা ১৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে থাকে। শিশু যদি সুস্থ স্বাভাবিক থাকে, ভালোভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করে, তবে টার্ম নবজাতকের পাঁচ-সাত দিনের মাথায়, প্রিটার্ম নবজাতকের দুই সপ্তাহ বয়সের দিকে আপনা–আপনিই তা সেরে যায়।


সব নবজাতককে প্রথম ৭২ ঘণ্টা বয়সে জন্ডিস দেখা দিয়েছে কি না, তা যাচাই করে নিতে হবে। শিশুর ত্বক, চোখ ও হাত–পা সূর্যের আলোয় পরীক্ষা করলে তা বোঝা যায়। জন্ডিস হয়েছে মনে হলে অবশ্যই ল্যাব টেস্ট করে বিলিরুবিনের মাত্রা নির্ণয় করা উচিত। বিশেষত তিন দিন বয়সে।


নবজাতকের জন্ডিস প্রতিরোধে গর্ভাবস্থায় মায়ের এবিও এবং আরএইচ রক্ত গ্রুপ পরীক্ষা ছাড়াও যথাযথ অ্যান্টিনেটাল কেয়ার গ্রহণ করা উচিত।


নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। নবজাতককে রোদে দিয়ে জন্ডিস কমানোর পুরোনো ধারণা ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে।


যেসব নবজাতক মারাত্মক জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে ও চিকিৎসা পেয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, বিশেষ করে কানে শোনা ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ যথাযথ হচ্ছে কি না, দেখা উচিত।


আরও পড়ুন : রিকাবীবাজারে ওয়াকওয়ে মিনি পার্ক উদ্বোধন


কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুর যত্ন:


যাদের জন্মকালীন ওজন ২৫০০ গ্রামের কম থাকে, তাদের লো বার্থওয়েট বা স্বল্প জন্মওজনি নবজাতক বলা হয়। এরা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ শিশু আর বিশেষ যত্ন প্রয়োজন।


এসব নবজাতকের যত্ন স্বল্প জন্মওজনি নবজাতকের সব চিকিৎসাব্যবস্থা প্রদানের সুবিধা থাকে, এমন কেন্দ্রে নেওয়া উচিত। বিশেষত যেসব নবজাতকের জন্মওজন ১৮০০ গ্রামের কম, গর্ভকাল ৩৪ সপ্তাহের কম, অসুস্থ বা মায়ের দুধ পানে অসমর্থ।


কমপক্ষে ১২ মাস বয়স অবধি এদের ভিটামিন-ডি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন জোগানো দরকার।


ক্যাঙারু কেয়ার পদ্ধতিতে নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রার সুরক্ষা দিতে হবে। বিশেষত হাসপাতাল ছাড়ার পর বাড়িতে যখন তাকে নেওয়া হবে।


বৃদ্ধি ও বিকাশ, বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি এবং নানা অসুখের জটিলতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কমপক্ষে ১২-১৮ মাস বয়স পর্যন্ত এই ফলোআপ চালিয়ে যেতে হবে।


আরও পড়ুন : একটু সহানুভূতি কি তারা পেতে পারে না?


বিশেষ যত্ন:


মা যদি হেপাটাইটিস সারফেস অ্যান্টিজেন পজিটিভ থাকেন, তবে শিশুকে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন ও হেপাটাইটিস-বি ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রদান করতে হবে।


মা যদি আরএইচ নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপের হন, তবে ভূমিষ্ঠকালীন নাড়ির রক্ত শিশুর রক্তের গ্রুপ ও অ্যান্টিবডি শনাক্তের জন্য পাঠাতে হবে।


ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের নবজাতক শিশু, প্রিম্যাচিওর বেবি অথবা অসুস্থ শিশুর রক্তের গ্লুকোজ জন্মের পর পর মাপতে হবে। গ্লুকোজ মান ৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার চিকিৎসা দিতে হবে।


হাসপাতালে থাকার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জেনেটিক স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম করা ভালো। উল্লেখ্য, থাইরয়েড হরমোন ও আয়োডিনের অভাবজনিত রোগ ‘কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম’ নিয়ে অসংখ্য শিশু প্রতিবছর আমাদের দেশে জন্ম নিচ্ছে।


অকারণ মৃত্যুরোধে নবজাতককে পিঠের ওপর বা একটু ডান দিকে কাত করে, শক্ত বিছানায় শোয়ানো উচিত। নরম তুলতুলে বিছানায় শোয়ানো হলে এক বছরের কম বয়সী শিশুর উল্টে গিয়ে শ্বাসরোধ পরিস্থিতির মতো বিপদের ঝুঁকি থাকে।


আরও পড়ুন : অভ্যাসই মানুষের দাস


লেখক:


অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী


সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


সান নিউজ/এইচএন



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top