অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিল পরিশোধ


উপকূলীয় এলাকায় কয়েকটি রেডিও স্টেশন ও লাইটহাউজ স্থাপন সংক্রান্ত প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নৌ পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ছয় কোটি ৩৭ লাখ টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে। লাইট হাউজ বা বাতিঘর প্রকল্প হিসেবে পরিচিত ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব গ্লোবাল মেরিটাইম ডিস্ট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম অ্যান্ড ইন্ট্রিগেটেড নেভিগেশন সিস্টেম (ইজিআইএমএনএস)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে এমন তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।

এছাড়া উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) ও সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) এবং নৌ পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) বিরুদ্ধে আনা কিছু অভিযোগেরও সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তদন্ত কমিটির সুপারিশে নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালককে (ডিজি) পদ থেকে প্রত্যাহার কথা বলা হয়েছিল, তা করাও হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী পিডি, ডিপিডি, এপিডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনও সুপারিশ করা হয়নি। 

পাঁচ সদস্যের কমিটি

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সঞ্জয় কুমার বণিকের নেতৃত্বে ২৬ এপ্রিল পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সম্প্রতি নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আটটি সুপারিশসহ ৪২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। বহুল আলোচিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নৌ পরিবহন অধিদফতর। এটি বাস্তবায়নের সর্বশেষ বর্ধিত সময়সীমা ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।   

তদন্তে কমিটি যা পেলো 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজির অনুমোদন না নিয়ে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ ছাড়াও পিডির বিরুদ্ধে আইসিটি ইকুইপমেন্ট মোবিলাইজেশনের কাজ শেষ করার আগেই এ খাতের টাকা ব্যয় করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের দুবলার চর ও ভোলার চর কুকরিমুকরিতে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ কাজের বিল পাসের তৎপরতার কথাও উল্লেখ করেছে কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে ডিপিডিসহ এপিডিদের বিরুদ্ধেও নানা অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া পিডির বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ কালক্ষেপণ হচ্ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে অচলাবস্থার জন্য পিডি, ডিজি ও ঠিকাদার– তিন পক্ষকেই দায়ী করেছে কমিটি। তারা হলেন- পিডি ও অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার আবু সাঈদ মোহাম্মদ দেলোয়ার রহমান, মহাপরিচালক কমডোর মো. নিজামুল হক এবং কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলজি আল সামিহ। তদন্তে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহ-ঠিকাদার নিয়োগ, বেআইনিভাবে দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ ও ভীতি প্রদর্শনসহ সাতটি অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তাকে মহাপরিচালকের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

ডিজি প্রত্যাহার

এদিকে, এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা না হলেও কমডোর নিজামুল হককে ইতোমধ্যে মহাপরিচালকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে নৌ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়েছে সরকার। তার স্থলে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নৌ বাহিনীতে কর্মরত কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলমকে। রবিবার (২১ মে) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (২২ মে) স্বপদেই রয়েছেন কমডোর নিজাম।

পিডির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পিডি আবু সাইদ মোহাম্মদ দেলোয়ার রহমানের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের কয়েকটি অভিযোগ যাচাইয়ে ‘কারিগরি কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করেছে কমিটি। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলজি আল সামহি কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

সূত্র মতে, এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে– পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ না দেওয়া; সংস্থা প্রধান, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব; যথাসময়ে কাজ না করা ইত্যাদি।

এছাড়া কয়েকটি কাজের বিল যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে কিনা এবং কাজের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা- তা খতিয়ে দেখতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ সংক্রান্ত সুপারিশে বলা হয়, ওই কমিটি এসব ঘটনায় প্রকল্পের কোন কোন কর্মকর্তা দায়ী তা নির্ধারণ করবে।

পিডি-ডিপিডি’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ নেই 

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর নৌ মন্ত্রণালয় কমডোর নিজামকে অধিদফতরের মহাপরিচালকের পদ থেকে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছিল। এরপর তাকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে সরকার। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী অন্যদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে পিডি, ডিপিডি, এপিডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনও সুপারিশ করা হয়নি। কারিগরি কমিটি গঠন করে এই কমিটির মাধ্যমে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দায়-দায়িত্ব যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, তদন্তকালে বিভিন্নজনের মৌখিক (অনানুষ্ঠানিক) জবানিতে ডিপিডি ও এপিডিদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কাজ না করে বিল পরিশোধের নামে প্রকল্পের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া কমডোর এ জেড এম জালালউদ্দিন নৌ অধিদফতরের ডিজি থাকাকালে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসে। প্রকল্পের কর্মকর্তাদের কোন কাজে কে কতো টাকা ঘুষ দিয়েছেন, তার বর্ণনা রয়েছে। ঘুষ বাবদ টাকা লেনদেনের এ ভয়ঙ্কর বক্তব্য ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও স্থান পেয়েছে। তবুও প্রকল্পের এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমডোর নিজামুল হক বলেন, বহুল আলোচিত ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি যথাসময়ে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য আলাদা দুটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এর একটি হলো– প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা। অপরটি হচ্ছে পিডিকে সরিয়ে দিয়ে এ পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া। এর স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট অনেক কারণও উল্লেখ করেছিলাম। তবে নৌ মন্ত্রণালয় আমার প্রস্তাব না মেনে নিজেরা একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেখানে অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কোনও প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এ ছাড়া পিডিকেও স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সঞ্জয় কুমার বনিক জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এর পরে তা নিয়ে কী হয়েছে না হয়েছে সে বিষয়ে আমি কথা বলার এখতিয়ার রাখি না। মন্ত্রণালয় সম্পর্কে কথা বলার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও রয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার রাখেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব মহোদয়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় কুমার বনিক জানিয়েছেন, নৌ পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালককে নৌ বাহিনীতে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উপর মহলের সিদ্ধান্ত। তাকে কেনও সরিয়ে নেওয়া হলো তা আমার জানার কথা নয়।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top